একটি বিদ্যালয় শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। যেখানে তারা নির্ভয়ে পড়াশোনা করবে, স্বপ্ন দেখবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। কি...
একটি বিদ্যালয় শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। যেখানে তারা নির্ভয়ে পড়াশোনা করবে, স্বপ্ন দেখবে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। কিন্তু হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বদলপুর ইউনিয়নের ৪৭ নম্বর দিগলবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে বিদ্যালয়ে না যাওয়ার কারণ পড়াশোনায় অনীহা নয়, বরং জীবন হারানোর ভয়।
জরাজীর্ণ ভবনের ছাদ ও বিম থেকে প্রতিনিয়ত পলেস্তারা খসে পড়ছে। কয়েকদিন আগে অভিভাবক সমাবেশ চলাকালে প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের একটি পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনায় যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা অভিভাবকদের সিদ্ধান্তে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সন্তানদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তারা বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে ১০৮ জন শিক্ষার্থীর একজনও বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়নি। এটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের উপস্থিতির সংকট নয়, এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা সংকটের প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও অভিভাবকরা রাজি হননি। তাদের এই অবস্থানকে অযৌক্তিক বলার সুযোগ নেই। কারণ কোনো অভিভাবকই জানেন না, সকালে সুস্থ সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে বিকেলে তিনি তাকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাবেন কি না। যখন বিদ্যালয় ভবনই দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকে, তখন পাঠদান চালিয়ে যাওয়াও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ইতোমধ্যে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য বিদ্যালয়টিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেছেন। কিন্তু আবেদন করার পরও যদি দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায় এবং বাস্তব কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে সেই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রাথমিক শিক্ষা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি। অথচ যদি সেই ভিত্তিই ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাহলে উন্নত শিক্ষার সব পরিকল্পনাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। শুধু দিগলবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন বহু জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান চলছে। এসব ভবনের তালিকা প্রস্তুত করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আমরা মনে করি, দিগলবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অবিলম্বে বিকল্প নিরাপদ স্থানে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। শিশুদের জীবন কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় হতে পারে না। একটি দুর্ঘটনার অপেক্ষায় না থেকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে দায়িত্বশীল প্রশাসনের পরিচয়।
